মাত্র একটা সাড়ে চার'শো ডলারের স্পিড-টিকিটের মামলায় জিতে, উকিলের জেরাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখাতে পেরে পোলো টি-শার্টের মধ্যেকার শরীর ঝুঁকিয়ে ফূর্তিতে আহমেদ মৃদু শিষ দিয়ে ওঠে। শিমুল তার লেমন ইয়েলো কার্ডিগান খুলে ফেলতে গিয়ে একটু পিছিয়ে পড়েছে, কালো মার্বেলের সিঁড়িতে নিজের থেবড়ে যাওয়া মুখ, অল্প দূর থেকে আহমেদের আমোদ দেখে হাসি পায় তার। মে মাসের শুরু, বালিয়াড়ির পদচ্ছাপের মত শীত মিলিয়ে গিয়েও রেশ রেখে যাচ্ছে। হন হন করে হাঁটতে গিয়ে আহমেদ থামে, শিমুলের জন্য। তার মানে আনন্দ ভাগ করে নেয়ার মত অবসর এখনো আছে!শিমুল মিথ্যে সাক্ষী দিতে এসেছিল, তবে তার প্রয়োজন পড়েনি। পিয়েরফঁ সিটি’র কোর্টরুমে দু’জনেই ঢুকেছিল। উকিল তখন একমনে নথিপত্র ঘাটছে। আরো দু’চারজন গাড়ি চালক তাদের মামলা নিয়ে হাজির। কেউই চেনা মুখ না, তবু অস্বস্তি লাগে। অভ্যাসমত মনে মনে মা’কে একচোট ঝাড়ে শিমুল,- ‘কেমন তখন রাজী হওনি, দিলে তোমার কোন ধর্মবই উষ্টা খেতো’। মায়ের আলঝেইমার চোখের ভাষাতে, যা গতবার দেশে গিয়ে দেখে এসেছে, প্রচ্ছন্ন জেদ হয় তার। -‘ কী, না ছেলে এডভোকেট, মিথ্যা কথা বলে টাকা কামাবে। এখন, তোমার নিজের মেয়েই মিথ্যা সাক্ষী দেয়’। তবে বৃথাই ঝাঁঝ দেখানো, কোর্টের জজসাহেব শিমুলের থোতা মুখ ভোতা করে ওয়েটিং রুমে অপেক্ষায় পাঠিয়ে আহমেদকেই শুধু জেরা করেছে। সারাটা সময় রিসেপশনের প্রৌঢ়া মহিলা চড়া মেকআপের আস্তর ভেদ করে, টেলিফোন ধরার ব্যস্ততায়ও ক্ষীণ প্রশ্নবোধক দিয়ে তাকে দেখেছে। ভিসিবল মাইনোরিটির দিকে এই রকম দৃষ্টি তার এতদিনে অভ্যাস হওয়া উচিৎ ছিল। তেমন তো কিছু না, একটু অনাত্মীয়সুলভ চাউনি, কেউই এসব গায়ে মাখে না। কিন্তু শিমুলের যে কী হয়!
উহু, কন্টিনিউয়াস টেন্স বানানও ভুল হবে। ওভার স্পিড, স্টপ সাইনে না থামা- এসব আহমেদের নৈমিত্তিক হলেও তাকে শুধু এর আগে একবার সাক্ষী দিতে বলেছিল, শিমুল আসেনি। এবার দোনোমনা করে এসেও কাজে লাগলো না। আহমেদের বুকের পাটা সঙ্গে সঙ্গে ফুলে দ্বিগুণ হলো! গাড়ি চালকের সেল ফোনে কথা বলা অবৈধ, ব্লু-টুথ দিয়ে কথা বলছে কারো সাথে। মামলা জেতার কাহিনী। আসলে জেরবার তেমন কিছু হয় না। এখানে প্রতিদিন যতলোকে গাড়ি চালাতে গিয়ে নিয়ম ভাঙ্গার জন্য টিকিট পায় তাদের তিরাশি ভাগ পে করে দেয়, বাকী সতের পার্সেন্টের অর্ধেককে সরকারী উকিল একটা দফারফায় আসতে বলে- পে হাফ অব দ্য ফাইন, মামলা খতম। দ্য রিমেইনিং হাফ অব দ্য সেভেন্টিন পার্সেন্টকে কেস লড়ে জিততে হয়, এ্যান্ড লেট মি টেল ইয়ু- আহমেদ তার মনগড়া পরিসংখ্যান দিয়ে জুৎ করে বাক্য সাজায়, ‘প্রায় সবাই জিতে যায়’। সে হচ্ছে সেই বিরলপ্রজাতির সাড়ে আট পার্সেন্ট যাদের জন্য জজ সাহেবের মায়াদয়া কম থাকে, কিন্তু সুবিধা হলো- এসব কেসের টিকিট প্রদানকারী পুলিশ অফিসার কালেভদ্রে কোর্টে হাজিরা দেয়, বদলে আরেকটা গাড়ির চালককে টিকিট ধরিয়ে দিলে তাদের ডিসিপ্লিন ঠিক থাকে, মুনাফাও বেশী। আর বিবাদী যদি একজন সাক্ষী নিয়ে যায়! আহমেদ, অতএব নির্বিঘ্নে বিচারককে বোঝাতে সক্ষম হয় যে স্পিডোমিটারের কাঁটা তার নিজেরটা ঠিকই ছিল, রোড-পুলিশ দু’জন গল্পগুজব করতে করতে দূর থেকে বন্দুকের নিশানা ভুল করেছে। ফলাফল, সে এখন গায়ে পুলক লাগিয়ে বাতচিৎ করছে। নিউইয়র্কের কনসার্ট শেষে শ্রেয়া ঘোষালকে কি উপায়ে জুলাই মাসেই মন্ট্রিয়ালের ম’লসঁন সেন্টারে এনে শো করা যায়-প্রোগ্রাম ফিক্সিং এ্যান্ড ট্যাক্সিং- আহমেদের নিত্যকার ব্যস্ততা, শুনতে শুনতে পার্বতীপুরে মায়ের সঙ্গে পুরনো ঝাঁঝটা ঝালাই করে নিতে এতদিন বাদেও সোজা হয়ে বসে শিমুল। ম্রিয়মাণ আগুনের আঁচের মত তার ক্ষোভ আপাতত আহমেদের পাশে সীট বেল্টের হুক দখল করে নেয়। আর আহমেদের কব্জির জরুল স্টিয়ারিং হুইলের বৃত্তে একবার দৃশ্যমান হয় আবার ঢেকে যায়। জরুলটা শিমুলের এত চেনা! অথচ এই লুকোচুরির চক্রে কেমন অপরিচিত ঠেকে। ‘প্রাণ সই গো আমি মরলে পোড়াইস না তরা...’ গাড়ির স্টেরিওতে মৃদু কণ্ঠ তীক্ষ্ণ স্বরে ত’রা তে টান দিলে শিমুলের বুক খা খা করে। এই খা খা করাটা থামানো দরকার, নইলে গরমকালেও মাইনাস ফোর্টি’র সূচ এসে কাটতে থাকে তাকে। এরকম জাঁকালো দিনে যখন যুবক রোদের ইয়ার্কিতে ম্যাপল গাছেরা যৌবন লুকিয়ে কূল পায় না, শিমুলের শীত লাগে, হাঁটু সমান স্নো সাঁতরানো, নাভিশ্বাস খাবি খাওয়া শীত।
রাস্তার সদ্য গজানো পাতাদের তিরতির কোরাস ভেঙ্গে, নিজের প্রিয় চায়নিজ রেস্তোরা মিং ছাড়িয়ে আহমেদ শিমুলকে ভিক্টোরিয়া মেট্রোর গেটে ড্রপ করে। গাড়ির দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিলে সেটা যখন আবার ভুস করে চলে যায় শিমুলের নিজেকে বহুবারের মত আবারো উদ্বাস্তু লাগে। মেট্রোর গেটে সারাগায়ে টাট্টু মারা ছেলেটা কি একটা ফ্লায়ার গছিয়ে দেয়। শিমুল পড়তে চেয়ে মন বসাতে পারে না। শ্রেয়া ঘোষালকে অনুষ্ঠান করতে আনার বাইরে আহমেদের আর কি কাজ তা জানতে চাইলে হতো। এস্কেলেটরের ওঠা-নামায় শিমুল আর নিজেকে ওপরে রাখতে পারে না। টিকিটঘরে ক্ষীণাঙ্গী, লিন্ডা না তো! নাম ধাম জানতে চাইলে হয়। পার্স হাতড়ে খুচরো বের করে, মাসকাবারী টিকিটটা কিনে নিলে ভালো হতো। আরো নিচে যাওয়ার সময় ট্রান্সফার টিকেটের মেশিন, পা ডুবিয়ে পাতালে নেমে যাওয়ার আগে হাত বাড়িয়ে নিতে নিতে শিমুল নিজেকে টেনে নামায়!
সকাল সাড়ে এগারোটার ভীড়াক্কারহীন ঠাণ্ডা মেঝের প্রায় নিঃশব্দ প্ল্যাটফর্মের এমাথা-ওমাথা পাক খায় শিমুল। ফ্লুরোসেন্ট হলুদ জ্যাকেট গায়ে একজন ওয়ার্কার ফোর্কলিফট চালিয়ে কী যেন টেনে নিচ্ছে। তরুণী। এটা লিন্ডা না তো! লিন্ডার সঙ্গে তার একটা কাল্পনিক কথোপকথন আছে, কাউকে দেখে লিন্ডা মনে হলে সে এটা চালায়। মিনিট বিশেক। তারা মুখোমুখি বসে টিম হর্টনে, দুটো কফি নেয়। লিন্ডার আইস ক্যাপাচিনো, ওর নিজের মিডিয়াম ক্যাফে মোকা। লিন্ডার চওড়া কপাল, সবুজ চোখ, সচেতন কণ্ঠনালী জড়িয়ে সিল্কের স্কার্ফ, নির্ঘাত আড়ং থেকে কেনা।সতর্ক শিমুল নিজেও। লিন্ডার চোখের কোণ থেকে অতিরিক্ত কিছু খুঁজতে চায় সে। তার- ‘কী’ এর জবাবে লিন্ডাও আরেকটা বড় ‘কী’ দিয়ে একটু সামনে ঝুঁকে আবার হেলান দিয়ে বসে। ও ফরাসি নাকি গ্রিক ভাষায় কথা বলে, শিমুল কিছুই বোঝে না। কথা খুঁজে না পেয়ে শিমুলের কপালের দু’পাশ দপ দপ করতে থাকে। মাঝে কিছুদিন লিন্ডাকে তার মনে ছিল না। আজকে আবার কপালের শিরার চাপ ফিরে আসছে।
ফোর্কলিফটওয়ালী কাছাকাছি এলে খুঁজে পেতেও মেয়েটার চোখের দেখা পায় না সে, চীন দেশীয়! ধীর গতির একটা শপাং শব্দে কম্পার্টমেন্টের দরজা খোলে। বিশালাকার পোস্টার আর ম্যুরালে ঠাঁসা দেয়ালের ছবি টবি দ্রুতগতিতে সরিয়ে মেট্রো একটা কালো শূণ্যতার দিকে রওনা দেয়। বেশীরভাগ বিজ্ঞাপনের মুখাবয়ব। শিমুলের কাছে অন্তত আজকে, আবার, সব মেয়ের মুখই লিন্ডার মুখ মনে হয়। জঁ’তালোঁ জাংশনে এক্সেলেটর চেপে নিচের প্ল্যাটফর্মে নামতে নামতে সে ঠিক করে – আবারো মেডিটেশন করা শুরু করতে হবে।
পার্ক এক্সটেনশন এখন আর গ্রিক, ইটালিয়ানদের ঘেটো নাই।
এশিয়া-মধ্যপ্রাচ্যদের প্রতি অভিমানে নাকি অচ্ছ্যুৎ জ্ঞানে দূরের শহরতলীতে চলে যাচ্ছে, শেষেরটা হবার সম্ভাবনা বেশী, শিমুল জানে। দু’এক ঘরের সঙ্গে রয়ে গেছে তাদের চার্চ, নামকরা বেকারী। বাদবাকী অধিকাংশই এথনিক স্টোর, ওপরে বড় অক্ষরে ফ্রেঞ্চ, নিচে একটু ছোট ইংরেজি বর্ণমালা, কেউ কেউ এরপর নিজের ভাষাও জুড়ে দেয় সাইনবোর্ডে। আগে একটা বড় ইন্ডিগোও ছিল, শিমুল দু’পাঁচটা বই কিনেছে, পেঙ্গুইন এডিশন দেখলে তার হাত নিশপিশ করে। তারপর সেও ঝাঁকের কই হয়ে মুভি দেখিয়ের দলে। ইমিগ্রান্টরা বই ফই তেমন পড়ে না, ইন্ডিগো লাটে উঠলো। বরং এথনিক দোকানপাটে মানুষ দেশ-বিদেশ খুঁজে বেড়ায়। হাতে কাজ কম থাকলে শিমুলও চটজলদি ঘুরে আসে- আর্মেনিয়া, কিনে ফেলে লেবানিজ হালুয়া, ইরান থেকে আসা শুকনো দারিম্বফলের বীচি, রসালো কাচা খেঁজুর। কখনো ছেলে-মেয়ের জন্য রংদার চায়নিজ সিল্কের টপ। আর নিজের দেশ, পাশের দেশের দোকানগুলি-সব পেয়েছির রাজ্য। এসব দোকানের কেউ কেউ তার রেগুলার ক্লায়েন্ট। চুল কাটে, ফেসিয়াল করায়। মুখ চেনা, প্রতিদিন দেখা হতে হতে আত্মীয়ভাব।
পার্লারের ঝাঁপ আজকে দানিয়েলার খোলার কথা। এস্থেটিক্সের ছাত্রীর চেহারায় বন্ধুবাৎসল্য আর শিমুলের এ বস্তুটির জন্য কাঙ্গালপনা, দিয়ে দিলো সে দানিয়েলাকে একটা চেয়ার ভাড়া। এখন ফেসিয়াল আর আইব্রো প্লাক করে স্কুলের অফ ডে’গুলোতে দিব্যি তার খরচ পোষায়। রুমানিয়া থেকে সব ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার ইমিগ্রান্টদের মধ্যে দানিয়েলারই নাকি শুধু ইকোনোমিক্সের ডিগ্রী! শিমুলের হাসি পায়-নিজের দেশেরও তো প্রায় একই হালত। দানিয়েলাকে পেয়ে ভাড়ার ওপর তার লাভ একজন বাড়তি মানুষ পাওয়া, সাফসুতরো করতে হাত লাগায়। এই এক জিনিসের প্রকট অভাব, মানুষ! মাল্টিপ্লিসিটি সিনেমার নায়কটার মত নিজের চার পাঁচটা ক্লোন করিয়ে ফেললে কেমন হয়?- একথা প্রায়ই শিমুলের মনে আসে। বেশ ক’বছর আগেকার হলিউডি ফিল্ম, বরাবরকার সেক্স-ক্লাইমেক্স ফর্মুলা। তিনজন পর্যন্ত ঠিক ছিল, চার নম্বরে এসে ক্লোনের মেকিং ত্রুটিপূর্ণ হয়ে গেল! শিমুলের হয়তো প্রথম ক্লোনটাই অমন হবে। এত কাজ জমে থাকে! জট বাঁধা চুলের মত কাজের লিস্ট মাথায় নিয়ে সে সবুজ বাতি জ্বলে ওঠার আগেই রাস্তা পার হতে দৌড় দেয়, সঙ্গে সঙ্গে বিরাট এক হর্ন। একদম কানের কাছে একটা হ্যামার, এত বড় গাড়িটা দেখলো না সে! মুহূর্তের জন্য হিম শীতল কাঁপুনির দেশ ঘুরে আসে, মৃত্যুভয় সংক্রান্ত ভাবনা জড়িয়ে ধরে একটানে তাকে নিজের দোকানে ফেলে দেয়।
মেট্রো স্টেশন লাগোয়া পার্কিং লটের ভাড়া এ মাস থেকে দশ ডলার বাড়িয়েছে। আগে তো আহমেদই নামিয়ে দিতো কাজে। কোৎ ভার্তু থেকে অরেঞ্জলাইন ধ’রে লিওনেল গ্রু’তে লাইন বদলিয়ে পার্ক এক্সে পৌঁছাতে তার লাগে মিনিট বিশেক। বন্দোবস্ত বদলাতে হলো। দূরে, কোলাহলহীন চারপাশ দেখে বাড়ি কিনে ফ্যাসাদ বাড়ানো আহমেদ ঠিকই ডাউন টাউনে এ্যাপার্টমেন্টে উঠে গেল। শিমুল এখন নিসর্গ দেখে, বাড়ির পেছন দিয়ে বয়ে যাওয়া রেললাইনে মালগাড়ির শব্দ শোনে। শুনতে শুনতে জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে লাল সবুজ ত্রিকোণ পতাকা ওড়াতে থাকা পার্বতীপুর জাংশনের সিগনাল ম্যানকে দেখতে পায়। কাঁচাপাকা ফেরারী দাড়িগোঁফ, হেলে প’ড়ে একবার লাল, একবার সবুজ ফ্ল্যাগ ওঠাও-নামাও-দোলাও। যাও, ছেড়ে যাবার দিলাম অনুমতি, আলোয় আলোয় এই আকাশে। স্টেশনের শেষদিকে ‘পুং’ আর ‘স্ত্রীলোক’ লেখা টয়লেটের বিবমিষা উদ্রেককারী বন্ধশ্বাস সেকেন্ডগুলো পার হয়ে যেখানে লাফ দিলে প্ল্যাটফরম শেষ, তারও পরে ছোট্ট গুমটিঘরের মত সিগন্যাল ম্যানের পাকা বসতবাটি। এত ছোট্ট ইটের বাড়ি হয়! কৈশোরের সেই বিস্ময়ের ধারে কাছে শুধু খলবলিয়ে গজানো কিছু ঝোঁপঝাড়-আকন্দ পাতার ধোঁয়াটে গাছ, আর ধ্যানরত সুবিশাল গোলাকার পানির ট্যাংকি, পানিবিহীন, ঢপ ঢপ বাজে। সিগন্যাল ম্যানের ভয় করে না? সে কি মাথার কাছে লম্বা তেলমাখানো লাঠি নিয়ে ঘুম যায়! কী হয়, যদি ট্রেনকে সিগন্যাল দেখাতে ভুলে যায়! লাঠিকে তার চৌপায়াতে শুইয়ে সে নিজে দরজার কোণে দাঁড়িয়ে থাকে? ঠায়? সারারাত!
ব্যাকইয়ার্ডে ক্ষেত করার স্বপ্ন জুতে দিয়ে আহমেদ তাকে রোলার কোস্টারে চড়িয়ে দিলো। ঘাস বড় হতে দেয়া ছাড়া সে কী-ইবা করবে? লন মোয়ার নাড়াতে তার হাড়গোড় নড়ে যায়। শখ করে লাগানো আপেল গাছটাকেও আর শীতের তাণ্ডবের সাথে যুদ্ধ শেষে যত্নআত্তি করতে মন চায় না। মিরাক্যল গ্রো’র সবুজ ছোট্ট বোতল অলস পড়ে থাকে গ্যারেজে। জীবনের ধন কিছুই যায় না ফেলা- শিমুলও কিছুই ফেলে না। তবে হাড়ে হাড়ে টের পায় প্রতিদিনকার জীবন তাকে ফেলে চলে যাচ্ছে! ইয়ান লম্বায় এখন তার কাঁধ সমান!
কর্তিত চুলের স্তুপ মেঝে থেকে একপাশে ঠেলে ফিলিপাইনি আঞ্জিকা’র ঘন চুলে পানি স্প্রে করে আরেক লেয়ার ক্লিপে আটকে রাখে শিমুল। ভেতরে ভেতরে পাকা চুল। রং তো চড়াবে নিশ্চয়ই, কে আর চুলের ঝাড়ে রূপালি ঝিলিক ভালোবাসে। চায় কিনা জিজ্ঞেস করতে গিয়ে নিজের সেল ফোন বাজে। আহমেদ, বাচ্চাদের স্কুল থেকে পিক করে তাকে নিতে আসছে। বাসায় পৌঁছে দেবে। টিকিট জেতার আনন্দ উদযাপন! তা নইলে ফুরসত কোথায়, নিজের নিঃশ্বাস দিয়ে ডলার গোনা আহমেদের! তারপর সেই নিঃশ্বাস কোথায় যেন উড়ে যায়! শিমুলের সঙ্গে তার কখনো সাক্ষাৎ ঘটে না।
ইয়ানের এক বন্ধুকে নামাতে হবে। সামনে পেছনে মিলিয়ে গাড়িতে তারা পাঁচজন। কেন জানি মনে হয় একটা সিট খালি থাকলে ভালো হতো। অদৃশ্য কেউ সেই সিটটা দখল ক’রে বসতো। তখন শিমুল পেছনে বসতো। অনেক কিছুর মত এটাও আহমেদ তার আয়ত্ত্বের মধ্যে নিয়ে নিতো। ইয়ানের হাইস্কুল নিয়ে আলাপ করার একটা সুযোগ হলো। “একটা ভালো স্কুল খুঁজে বের করতে হবে। ওদের ওপেন হাউস কবে সে ডেটগুলি জানা দরকার, তুমি একটু ইন্টারনেট ঘেটে বের করো না” আহমেদের উদাসীনতা শিমুলের মাথায় আগুন ধরায়। নেভানোর জন্য ইয়োগা ক্লাসে শেখা বিদ্যা প্রয়োগ করার চেষ্টা করে। কে যেন বলেছিল- মাটির দিকে তাকালে রাগ কমে। চলন্ত গাড়ি থেকে মাটি কোথায়? তার যাওয়া আসার পথে শুধু ঘাসে ঢাকা প্রান্তর, ফ্যাক্টরি আর বিরাট বিশাল শপিং মল। সামনে-পেছনে নিযুত কোটি গাড়ি, পিল পিল, শোঁ শোঁ শব্দপ্রবাহ। সিমেন্ট বাঁধাই রাস্তাঘাটে একচিমটি মাটি দেখতে শিমুল জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে থাকে।
এস্থেটিক্সের কোর্স না করলে ঘণ্টায় বড়জোর দশ-বারো ডলার, এখন এক ফেসিয়ালেই শিমুল পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন পার্সে চালান করে। আহমেদের কম্যুনিটি ওয়ার্ক-অনুষ্ঠানাদি এসব থেকে একটা পরিচিতিও হয়েছে। সবতো ঠিকই চলছিল। আহমেদকে রেস্টুরেন্ট না খুলতে দিলে হতো। লিন্ডাকে নিয়ে তাহলে শিমুলের লাগাতার টিম হর্টনি মিটিংগুলি মুলতবি থাকতে পারতো। কিন্তু শুনতো কি? মানুষ দেশ ছাড়ে ওপরে ওঠার পাখায় ভর করে, আর আহমেদ পাখা ছাড়া উড্ডয়ন শিক্ষা করেছে!
আহমেদের ধারণা স্বপ্ন দেখতে অভ্যস্ত ছিল শিমুল। চোখ বন্ধ করে – এ ওর আঙ্গুল দিয়ে চোখের পাতা ছুঁয়ে দিয়ে তারপর দু’জনেই অন্ধ। সেগুলোর স্পর্শ নিতে নিতে আহমেদ তার রোলার কোস্টার কেনার স্বপ্ন ফিস ফিস করে। মন্ট্রিয়ালের ফ্যান্টাসি পার্ক ‘ল্যা রন্দ’ এর প্রচণ্ড গতির বিশালাকার রোলার কোস্টারটাই সে কিনবে।
-‘হাউ এবাউট কিপিং দ্যাট ইন আওয়ার ব্যাকইয়ার্ড’! তখনো বাড়ি কেনা হয়নি। পার্ক এক্সে দু’ রুমের বারান্দায় স্বপ্ন দেখা আরো সহজ! রোলার কোস্টারে বসে শিমুল মাথা উজিয়ে প্রায় আকাশ ছুঁতে পারে। নিচে ক্ষুদ্রাকৃতির ওল্ড পোর্ট, অলিম্পিক স্টেডিয়াম, মন্ট্রিয়ালে ওয়ার্ল্ড এক্সপো’র সময়কার আমেরিকান স্থাপনা – শাদা স্টিল কিন্তু ক্রিস্টালের মত দেখায়। শিমুলের মাথা ঘোরে, শক্ত করে আহমেদের হাত আঁকড়ে ধরে সে। ব্যাক- ইয়ার্ডে হলে খারাপ হয় না। -‘হাম ফ্যামিলি লেকে এ্যায়েশ করেঙ্গে’।
কাকে কাকে নিয়ে আসা যায় দেশ থেকে? রোলার কোস্টারে কতজন বসা যায়? মা, তিনু খালা, সদ্য গোঁফ গজানো ন্যাওটা খালাতো ভাইটা। খাটতে খাটতে ফিমার বোনে গুটলি পাকানো মাংস সমেত খালু, এখনো অন্তত দশ বছর ভালো পরিশ্রমের উপযুক্ত। খাটনেওয়ালা মানুষ চাই, ওয়ার্কিং এইজগ্রুপ। সবাইকে এনে রোলার কোস্টারে চড়াবে তারা। ওপর থেকে নিচে নামতে নামতে দেখা যায় হাই স্পিড শিমুলেরও ভালো লাগে। স্লো স্পিডে ভয়। জীবনের চোরাগুপ্তা গতিকে ভয়। জড়ভরত এই গতির অস্তিত্ব জেনে কাউকে কিছু বলার আগেই সে টের পায় কখন যেনো নিজেও আবার রোলার কোস্টারে চড়ে বসেছে, উঠছে-নামছে সাঁই সাঁই, কিন্তু থামানো যাচ্ছে না। এখন আর শুধু ব্যাকইয়ার্ডে নেই, পুরো বাড়িটাই রোলার কোস্টার। এত বড়! এত স্পিডি! শিমুল সেই সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর উঠে বসে এতে, সারা দিনমান শুধু ওপরে ওঠা আর নামা, একা একা শিমুল শ্বাস বন্ধ, আবার একা একা হৃদস্পন্দন ফিরে পাওয়া।
যেদিন আসে, বাচ্চাদের শোবার ঘরে গুডনাইট চুমু দিতে ব্যত্যয় হয় না আহমেদের। দু’মাস আগেও খুব বুক কুকড়ে আসতো। এখন মজ্জাগত হচ্ছে অভ্যাস, নাহ, অত খারাপ লাগে না শিমুলের। বন্দোবস্ত সবই তো আহমেদের, সে শুধু ফরম্যাল হতে শিখেছে। ঠোঁট চেপে দরকারি কথা। কাজের কাপড় ঘরে ঢুকেই আর না ছাড়া। গ্লাভস হাতে কিচেনের সিংকে ব্লিচ ঢালে। আহমেদ এসব সময়ে ব্যতিব্যস্ত তাকে হাত নেড়ে বেরিয়ে যায়। আজকে বসলো, কেন! সাড়ে দশটা বাজে। রত্নাকরের ফেরার সময় হয়ে এলো। ওর সিফট তিনটা-এগারো। এই ছেলেটাকে বেইজমেন্ট ভাড়া দিয়ে কোনও আফসোস নেই শিমুলের। ইয়ান-মিশার সঙ্গে সঙ্গে সে নিজেও ওর ইডলি দোসার ভক্ত হয়ে গেছে। সিংক ঘষে ঘষে শাদা করে শিমুল, কালকের লাঞ্চ বানানো বাকি, তিন তিনটা বক্স। আহমেদ টিভি রিমোর্ট নিয়ে নাড়ে চাড়ে, অন ক’রে একটু পরে অফ। সে কি শিমুলকে কিছু বলবে! লিভিং রুম আর কিচেনের মাঝের কাউন্টারের ওপর দিয়ে ওর চুল, কাঁধের অংশ দেখা যায়। শিমুল কি ওকে খেতে সাধবে? লিন্ডা তো শুনেছে, শুটকি মাছও রাধতে শিখে গেছে! তা নইলে আহমেদের বেঙ্গলী জিভ খড়খড়ে থাকে না। শিমুলের কি ওকে প্রশ্ন করা উচিৎ! ওর ব্যবসাপাতি কেমন চলে! শিমুল অনেকদিন জানতে চায় না। আহমেদ টাকা কামাইয়ের কত ঘোৎ ঘাত বোঝে, শিমুল তো সেখানে দুগ্ধপোষ্য। ও শুধু জানে খাটতে। সেপারেশনের আইডিয়া আহমেদের। শিমুল যেন বাচ্চাদের নিয়ে কুয়োয় ডুবে না মরে সেজন্য বাড়িটা রইলো। বিয়ের কাগজ নাকি কিছুই না। কিন্তু সেই কাগজের অভাবেই তারা এমন আলগা হয়ে গেল!
পার্বতীপুরকে তাড়িয়ে এনে বাড়ির পেছন দিয়ে ট্রেন পাস করে যায়। সাড়ে এগারোটার ট্রেন। রত্নাকর এই ট্রেনটায় ফেরে, দু’একদিন ট্রেন মিসও করে ফেলে। আচ্ছা, আহমেদ যদি আবার ফিরে আসতে চায়! শিমুল তাহলে কি করবে? আহমেদের জন্য ভাবনা হবার বদলে আজকাল বরং রত্নাকর দেরি করে ফিরলে দুশ্চিন্তা হয় শিমুলের।
বি. দ্র. গল্পটি লেখকের সদ্য প্রকাশিত গল্পগ্রন্ধ জাঁকড় থেকে নেওয়া। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে দিব্যপ্রকাশ।
প্রকাশিত হয়েছে
গল্প
